Bisswa Bangla

কৃষকদের ৯০০ কোটির দুই প্রকল্প, ১২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে কাঠগড়ায় ইব্রাহিম খলিল-মাহমুদুল আলম!

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৭ পিএম
কৃষকদের ৯০০ কোটির দুই প্রকল্প, ১২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে কাঠগড়ায় ইব্রাহিম খলিল-মাহমুদুল আলম!
ইব্রাহিম খলিল এবং মাহমুদুল আলম।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) প্রায় ৯০০ কোটি টাকার দুটি পৃথক প্রকল্পে দরপত্র কারসাজি, কমিশন বাণিজ্য, নিম্নমানের যন্ত্রপাতি কেনা এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সংস্থাটির প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল এবং কৃষি বীজ বিপণন প্রকল্পের সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ মাহমুদুল আলম। এর মধ্যে মাহমুদুল আলমের বিরুদ্ধে অন্তত ১২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে প্রায় ২৯২ কোটি ৮৬ লাখ টাকার প্রকল্পে দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা। 

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, বিএডিসির বিদ্যমান বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে দরপত্রের শর্ত পরিবর্তন, যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে বাদ দেওয়া এবং পছন্দের ঠিকাদারদের কার্যাদেশ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন ঠিকাদারের দাবি, দরপত্রের শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ ও প্রয়োগ করা হয়েছে, যাতে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ থেকে অনেক প্রতিষ্ঠান বঞ্চিত হয়।

ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগের একটি হচ্ছে সিড ড্রায়ার সরবরাহের দুটি দরপত্রে কারসাজি। অভিযোগ অনুযায়ী, Tender ID 1178841 (MIEF/GD-19.01) এবং Tender ID 1178840 (MIEF/GD-19.02) নম্বরের দরপত্রে কারিগরিভাবে গ্রহণযোগ্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবকে ‘নন-রেসপন্সিভ’ দেখিয়ে বাদ দেওয়া হয়। বিপরীতে Consent Merchant নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

ইব্রাহিমের টেন্ডার কারসাজি ও মাহমুদুলের ১২০ কোটি আত্মসাতের দাবি

অভিযোগকারীদের দাবি, কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবিত যন্ত্রপাতির কারিগরি বৈশিষ্ট্য দরপত্রে নির্ধারিত স্পেসিফিকেশনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটিকে নির্বাচিত করা হয়েছে। এ ঘটনায় দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সংশ্লিষ্ট কার্যাদেশ বাতিল এবং পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।  

কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত Master Climate Solutions-এর BV 691TR মডেলের হিট এক্সচেঞ্জার নিয়েও আপত্তি রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, যন্ত্রটির হিটার ও ব্লোয়ারের সক্ষমতার মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, যন্ত্রটির সক্ষমতায় ঘাটতি থাকলে বীজ শুকানোর কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। এতে পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বীজের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে যন্ত্রপাতির প্রকৃত সক্ষমতা ও দরপত্রের কারিগরি শর্ত যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। প্রয়োজনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মাধ্যমে স্বাধীন কারিগরি পরীক্ষা করানোর কথাও বলেছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা।

ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে দরপত্রে কার্যাদেশ পাইয়ে দেওয়া এবং ঠিকাদারদের বিল অনুমোদনের বিনিময়ে কমিশন গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের বিভিন্ন কাজ নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় একটি কথিত ঠিকাদারি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগ করেছেন তাঁরা।

এ ছাড়া কয়েক মাসের ব্যবধানে ২০০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের শতাধিক দরপত্র একসঙ্গে চলমান রাখার অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের ভাষ্য অনুযায়ী, এত বিপুলসংখ্যক দরপত্রের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ব্যাংকসংক্রান্ত নথি ও কারিগরি প্রস্তাব প্রস্তুতে পর্যাপ্ত সময় পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেক যোগ্য প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিতে পারেনি বলে তাঁদের দাবি। 

অভিযোগকারীরা আরও জানিয়েছেন, দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন করা হলেও তা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। তাঁদের মতে, দরপত্রের সময়সূচি, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং কার্যাদেশের তথ্য পরীক্ষা করলে প্রকৃত চিত্র জানা সম্ভব।

প্রকল্পের অবকাঠামোগত সংস্কার ও নির্মাণকাজেও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল-ভাউচার প্রস্তুত করা হয়েছে। অথচ বাস্তবে সম্পন্ন কাজের পরিমাণ ও দেখানো ব্যয়ের মধ্যে অসংগতি রয়েছে।

বিএডিসির যশোর, ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গার আঞ্চলিক বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের আট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রায় ২ কোটি ৬৮ লাখ টাকার হাইব্রিড ধান ও গমের বীজ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের একাংশ এসব ঘটনার সঙ্গে প্রকল্প পর্যায়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য যোগসাজশের অভিযোগ তুলেছেন। তবে এসব বীজ আত্মসাতের ঘটনায় ইব্রাহিম খলিলের সরাসরি সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ নেই।

এদিকে, ইব্রাহিম খলিলের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, প্রকল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতা, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত যোগ্যতা এবং নিয়োগের প্রযোজ্য শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। 

এসব অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রী, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বিএডিসির চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগকারীরা সংশ্লিষ্ট দরপত্রের কার্যাদেশ পুনঃপর্যালোচনা, প্রকল্পের আর্থিক নিরীক্ষা এবং যন্ত্রপাতির স্বাধীন কারিগরি পরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিলের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, বিএডিসির প্রায় ৬০০ কোটি টাকার কৃষি বীজ বিপণন প্রকল্পের সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ মাহমুদুল আলমের বিরুদ্ধে অন্তত ১২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্প পরিচালনার সময় তিনি ঘনিষ্ঠ একটি কথিত সিন্ডিকেটের সহায়তায় দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো, কমিশন গ্রহণ এবং নিম্নমানের সরঞ্জাম কেনার মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপব্যবহার করেছেন।

সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের অভিযোগ, প্রায় তিন বছর ধরে প্রকল্পটির বিভিন্ন কেনাকাটা ও ঠিকাদারি কাজে নিয়মিত কমিশন বাণিজ্য চলেছে। নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া, বিল দ্রুত ছাড় করানো এবং প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত মূল্য দেখানোর বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়েছে বলে তাঁদের দাবি।

মাহমুদুল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের ক্রয় ও অর্থ বরাদ্দের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে একটি ঠিকাদারি সিন্ডিকেট প্রভাব বিস্তার করেছে। এর মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থের অপব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।

প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে সরঞ্জাম কেনাকাটায় অতিরিক্ত ব্যয় এবং নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সরঞ্জামের প্রকৃত বাজারমূল্য, সরবরাহ করা পণ্যের গুণগত মান এবং প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতির সঙ্গে দেখানো ব্যয়ের অসংগতি ছিল। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর মাহমুদুল আলমকে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিভাগে দায়িত্ব পালন করছেন বলে সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। তবে তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরানোর প্রশাসনিক কারণ এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।


মাহমুদুল আলমের বিরুদ্ধে প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর দায়িত্ব পালনকালীন আয়, সম্পদ, ব্যাংক লেনদেন এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি পরীক্ষা করা হলে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হবে।

এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে কথিত অবৈধ আয়ের একটি অংশ বিদেশে পাচার এবং পরিবারসহ দেশত্যাগের প্রস্তুতি নেওয়ার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। তবে অর্থ পাচার বা দেশত্যাগের প্রস্তুতির পক্ষে কোনো যাচাইকৃত নথি কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিশ্চিত তথ্য সরবরাহ করা হয়নি।

বিএডিসির এই দুটি প্রকল্পের মোট বরাদ্দ প্রায় ৮৯২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে একটি প্রকল্পে দরপত্র ও যন্ত্রপাতি কেনাকাটার অনিয়ম এবং অন্যটিতে ১২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। তবে অভিযোগে উল্লিখিত অর্থের পরিমাণ স্বাধীন নিরীক্ষা বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হয়েছে, এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।

কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, মানসম্মত বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কৃষকের কাছে বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে বিএডিসির এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পে কেনাকাটা ও অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম হলে সরকারি অর্থের ক্ষতির পাশাপাশি বীজের মান ও সরবরাহব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অভিযোগকারীরা দুই কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনকালীন দরপত্র, কার্যাদেশ, ঠিকাদারদের বিল, যন্ত্রপাতি সরবরাহ, প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি এবং আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেছেন। একই সঙ্গে নিরপেক্ষ কারিগরি মূল্যায়ন ও স্বাধীন অডিটের মাধ্যমে সরকারি অর্থের প্রকৃত ব্যবহার যাচাইয়ের আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

তবে ইব্রাহিম খলিল ও মাহমুদুল আলমের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর কোনোটিই সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত বলা যাচ্ছে না। মাহমুদুল আলমের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় এবং সরকারি অর্থের প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে নথিভিত্তিক স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। সূত্র: জুম বাংলা

বিশ্ববাংলা ফলো করুন

আপডেট, ভিডিও ও ব্রেকিং নিউজ পেতে সামাজিক মাধ্যমে যুক্ত থাকুন।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত