রাষ্ট্রপতির ১.২০ লাখ, প্রধানমন্ত্রীর ১.১৫ লাখ—বাড়ছে সম্মানি!

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পর এবার রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের বেতন-ভাতা পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করতে এসব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও সাংবিধানিক পদধারীর সম্মানি ও ভাতা বাড়ানোর বিষয়টি সামনে এসেছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অতীতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামো পরিবর্তনের পরপরই রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের সম্মানি পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এবারও সে প্রক্রিয়া অনুসরণ করার বিষয়ে আলোচনা রয়েছে। তবে বিষয়টি এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। কারণ, সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় নিজেদের সম্মানি বাড়ানোর বিষয়ে আগ্রহী নন। কয়েকজন মন্ত্রী-এমপি মনে করছেন, জনগণের অর্থনৈতিক চাপের সময় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সম্মানি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হলে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
অন্যদিকে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি এবং মন্ত্রী-এমপিদের সম্মানি বৃদ্ধির বিষয়টি এক নয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চাকরির বিনিময়ে নির্ধারিত বেতন পান এবং তাদের বেতন কাঠামো পরিবর্তন প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ। বিপরীতে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে তাদের সম্মানি পুনর্নির্ধারণে জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন বলেন, বর্তমান সংসদ সদস্যরা যে বেতন-ভাতা পান, সেটা খুব অপ্রতুল। কিন্তু বর্তমানে দেশের ক্রাইসিস মুহূর্তে এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কোনো আপত্তি বা চাহিদা কোনোটাই নেই। সরকারপ্রধান এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে আমরা তা মেনে নেব।
এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন ও বিধি অনুবিভাগ) শামীম সোহেল বলেন, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বেতন বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। এলে আমরা দ্রুত কার্যক্রম শুরু করব। রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ অ্যাক্ট সংশোধনের মাধ্যমে তাদের বেতন বাড়ানো হবে বলে জানান তিনি।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে শর্তে বলেন, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর বেতনও বাড়বে। কারণ স্বাভাবিকভাবেই সচিবদের বেতনের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর বেতনের একটি ফারাক আছে। তাই নিয়মানুযায়ী এটাও বাড়বে। এটা নিয়ে কাজ শুরু হবে।
রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর সম্মানি ছাড়িয়ে গেছে সচিবের বেতন
নবম জাতীয় পে স্কেলের নতুন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের সর্বোচ্চ বেতন এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা। এর ফলে একজন সচিবের মূল বেতন এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা। ২০১৬ সালের দ্য প্রেসিডেন্টস (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) অ্যাক্ট অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মাসিক বেতন এক লাখ ২০ হাজার টাকা। ফলে নতুন পে স্কেল অনুযায়ী একজন সচিবের মূল বেতন রাষ্ট্রপতির বেতনের চেয়ে ৩৬ হাজার টাকা বেশি। একই ভাবে প্রধানমন্ত্রীর মাসিক সম্মানির (এক লাখ ১৫ হাজার টাকা) চেয়ে সচিবের মূল বেতন ৪১ হাজার টাকা বেশি। একই ভাবে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মাসিক সম্মানিও এখন সচিবদের চেয়ে কমে গেছে। অবশ্য শুধু মূল বেতন দিয়ে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীদের আর্থিক সুবিধার হিসাব করা যায় না। এসব পদে দায়িত্ব পালনের সঙ্গে আবাসন, পরিবহন, চিকিৎসা, স্টাফসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা যুক্ত রয়েছে।
আইন সংশোধন ছাড়া এমপি-মন্ত্রীদের সম্মানি বৃদ্ধির সুযোগ নেই
এদিকে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো সরকারি আদেশ জারি করে সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীদের সম্মানি বাড়ানোর সুযোগ নেই। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো তাদের সম্মানি প্রতিবছর স্বয়ংক্রিয় ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে বাড়ে না। এজন্য সংশ্লিষ্ট আইন বা আদেশ সংশোধন করে জাতীয় সংসদে বিল পাস করতে হয়।
সংসদ সদস্যদের বেতন ও ভাতা নির্ধারিত হয় ‘সংসদ সদস্য (পারিতোষিক ও ভাতাদি) আদেশ, ১৯৭৩’-এর আওতায়। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের সম্মানি ও বিশেষাধিকার নির্ধারিত হয় সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী।
২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে স্কেলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন বাড়ানোর পরের বছর রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সম্মানি-ভাতাও পুনর্নির্ধারণ করা হয়। তখন রাষ্ট্রপতির মাসিক সম্মানি এক লাখ ২০ হাজার টাকা এবং প্রধানমন্ত্রীর এক লাখ ১৫ হাজার টাকা করা হয়। একই সময়ে মন্ত্রীদের সম্মানি এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা, প্রতিমন্ত্রীদের ৯২ হাজার টাকা এবং উপমন্ত্রীদের ৮৬ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়। এছাড়া সংসদ সদস্যদের মাসিক বেতন ৫৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।
মূল বেতনের বাইরে রয়েছে বিভিন্ন ভাতা
বর্তমানে একজন সংসদ সদস্যের মাসিক মূল বেতন ৫৫ হাজার টাকা হলেও বিভিন্ন মাসিক ভাতা মিলিয়ে একজন সংসদ সদস্যের মাসিক নির্ধারিত আর্থিক সুবিধা দাঁড়ায় দুই লাখ ১৪ হাজার ২০০ টাকা। এর বাইরে সংসদ অধিবেশনে অংশগ্রহণের জন্য দৈনিক ৮০০ টাকা ও যাতায়াত ভাতা ২০০ টাকা দেওয়া হয়। দেশের অভ্যন্তরে বিমান, রেল বা স্টিমারে ভ্রমণের জন্য বছরে এক লাখ ২০ হাজার টাকার ট্রাভেল ভাউচার রয়েছে। এছাড়া এলাকার কল্যাণে বছরে পাঁচ লাখ টাকা ঐচ্ছিক তহবিল এবং আকস্মিক মৃত্যু বা পঙ্গুত্বের ক্ষেত্রে ১০ লাখ টাকার বীমা সুবিধা রয়েছে।
মন্ত্রীদের জন্য আবাসন, গাড়িসহ নানা সুবিধা
মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরাও মূল বেতনের বাইরে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুবিধা পেয়ে থাকেন। বিনামূল্যে সম্পূর্ণ সুসজ্জিত সরকারি বাসভবন, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের সুবিধা পান তারা। সরকারি বাসভবনে না থাকলে মন্ত্রী মাসে ৮০ হাজার টাকা এবং প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী ৭০ হাজার টাকা আবাসন ভাতা পান।
৫৩ বছরে এমপিদের বেতন বেড়েছে ১৩৭ গুণের বেশি
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদে ১৯৭৩ সালে একজন সংসদ সদস্যের মাসিক মূল বেতন ছিল মাত্র ৪০০ টাকা। একই সময়ে একজন মন্ত্রীর বেতন ছিল ১,০০০ টাকা। পরে কয়েক দফা আইন সংশোধনের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের বেতন বাড়ানো হয়। ১৯৮৮ সালে তা ১,৫০০ টাকা, ১৯৯২ সালে ৩,০০০ টাকা, ১৯৯৮ সালে ৭,৫০০ টাকা, ২০০৫ সালে ১১ হাজার টাকা, ২০১০ সালে ১৫ হাজার টাকা এবং সবশেষ ২০১৬ সালে ৫৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে এর সঙ্গে বিভিন্ন ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা যুক্ত হওয়ায় একজন সংসদ সদস্যের মোট আর্থিক সুবিধার পরিমাণ শুধু মূল বেতন দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না।
এ বিষয়ে সাবেক সচিব আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রীয় ঊর্ধ্বতন পদাধিকারীদের সম্মানি এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতনের তুলনা করা ঠিক নয়। কারণ জনপ্রতিনিধিত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়টি মূলত জনসেবা, যা টাকা বা অর্থ দিয়ে বিচার বা মূল্যায়ন করা যায় না। অন্যদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের পদটি হলো নিয়মিত বেতনভুক্ত চাকরি।
আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, ব্রিটিশ বা পাকিস্তান আমলে এ ধরনের পদগুলোয় আলাদা সম্মানি ছিল না। পরে সময়ের সঙ্গে জীবন-জীবিকার তাগিদে সম্মানি ও ভাতার ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। যেহেতু সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে, তাই রাষ্ট্রপতি বা অন্য জনপ্রতিনিধিদের সম্মানি পুনর্নির্ধারণ বা বৃদ্ধির একটি যৌক্তিক ভিত্তি ও যুক্তি তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববাংলা ফলো করুন
আপডেট, ভিডিও ও ব্রেকিং নিউজ পেতে সামাজিক মাধ্যমে যুক্ত থাকুন।
